সংস্কারের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে তিলকখালী খাল

নেত্রকোনা:


নেত্রকোনা সদর উপজেলার মেদনী ইউনিয়নের তিলকখালী খাল আজ নীরবে হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই খালটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে বর্তমানে প্রায় সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে এলাকায় সেচ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, বেড়েছে কৃষি উৎপাদন খরচ এবং খালনির্ভর দেশীয় মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনা জেলায় বর্তমানে ছোট-বড় মোট ১৫৯টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে তিলকখালী খালটি একসময় বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। ভদ্রপাড়া, মেদনী, কৃষ্ণপুর, রামপুর, বালুয়াখালী, কার-বাংলা ও বড়ওয়ারি গ্রামের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এই খালের পানির ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ হতো।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় নেত্রকোনা অঞ্চলে সেচ সুবিধার অভাব, জলাবদ্ধতা ও মৌসুমি খরার কারণে বহু জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। সেই সংকট দূর করতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে ‘মাটি ও মানুষ’ কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের উদ্যোগ নেন।

তিলকখালী খাল খননও ছিল সেই ঐতিহাসিক কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৭৯ সালে শহীদ জিয়াউর রহমান দুইবার নেত্রকোনা সফর করেন এবং তিলকখালী খালের খনন কাজ সরাসরি তদারকি করেন। তাঁর আহ্বানে কৃষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননে অংশ নেন। তিনি নিজ হাতে কোদাল তুলে কাজ করায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এর ফলে কয়েকশ একর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হয় এবং কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।

তবে সময়ের ব্যবধানে সেই সাফল্য ম্লান হয়ে গেছে। খালটির বিভিন্ন অংশ দখল, পলি জমা ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে খালটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ফলে নতুন প্রজন্ম এই খালকে শুধু ইতিহাসের অংশ হিসেবেই জানতে পারছে।

মেদনী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফকরুল ইসলাম খান (রতন মিয়া) বলেন, “শহীদ জিয়াউর রহমানের খাল খননের দৃশ্য এখনো এলাকার মানুষের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। সে সময় বিনামূল্যে সেচযন্ত্র বিতরণ করা হয়েছিল, যা কৃষকদের জন্য ছিল বড় সহায়তা।”

স্থানীয় কৃষক দুলাল মিয়া বলেন, “খাল খননের পর সারা বছর পানি পাওয়া যেত। সেচ সহজ ছিল, পাশাপাশি প্রচুর দেশীয় মাছ ধরা পড়ত। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই সুবিধাগুলো আর নেই।”

এ বিষয়ে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, বর্নি বিল থেকে উৎপন্ন হয়ে কংস নদীতে মিলিত হওয়া সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ তিলকখালী খালটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকাভুক্ত। তিনি বলেন, “খালটি পুনঃখননের জন্য শিগগিরই সার্ভে ও নকশা প্রণয়ন শেষে কাজ শুরু করা হবে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত সংস্কার ও পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু হলে তিলকখালী খাল আবারও এলাকার কৃষি, সেচ ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Please follow and like us:

     এই বিভাগের আরো খবর

আমাদের পেজ লাইক করুন

error: Content is protected !!