আদানির বিদ্যুৎ চুক্তিতে বছরে শত শত মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়: জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে প্রতিবছর শত শত মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকারের জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি)। কমিটির মতে, এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতি, শিল্পখাত ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।

রোববার বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে এ মন্তব্য করেন কমিটির সদস্যরা। কমিটি গত ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিটি জানায়, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে জরুরি আইনের প্রয়োগের কারণে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। এর সুযোগ নিয়ে কয়েকটি বড় চুক্তিতে অতিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং চুক্তির ঝুঁকি একতরফাভাবে রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পর্যালোচনা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম অন্যান্য উৎসের তুলনায় ৪ থেকে ৫ সেন্ট বেশি নির্ধারিত হয়েছে। চুক্তির শুরুতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ছিল ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট, যা বিভিন্ন শর্ত ও সমন্বয়ের ফলে ২০২৫ সালে গিয়ে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে পৌঁছেছে। এর ফলে বাংলাদেশকে বছরে অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হচ্ছে।

কমিটি সতর্ক করে জানায়, চুক্তিটি বহাল থাকলে আগামী ২৫ বছর ধরে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন ব্যয়ের সক্ষমতার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।

সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ২০১১ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (আইপিপি) কাছে সরকারের পরিশোধের পরিমাণ ১১ গুণ বেড়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। এর ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) প্রতিবছর ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দিচ্ছে এবং ২০২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এই ঘাটতি সামাল দিতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম যদি ৮৬ শতাংশ বাড়ানো হয়, তবে বাংলাদেশের বিদ্যুতের দাম ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বেশি হয়ে যাবে। এতে দেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানির সঙ্গে করা চুক্তিতে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে আদানি কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে তাদের বক্তব্য নেওয়া উচিত। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে সিঙ্গাপুরে চুক্তি সংক্রান্ত সালিশি মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিলম্ব হলে আইনি দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলার জন্য এত শক্ত তথ্য খুবই বিরল।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাত থেকে আটজন ব্যক্তির অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ডলার। এসব বিষয়ে ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) হস্তান্তর করা হয়েছে এবং দুদক ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।

জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রধান, হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়; এটি নির্দিষ্ট নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ফল। এখন রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি বহন করা হবে, নাকি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের এই জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী এবং কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আলী আশরাফ।

Please follow and like us:

     এই বিভাগের আরো খবর

আমাদের পেজ লাইক করুন

error: Content is protected !!