চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটির দায়িত্ব বেসরকারি হাত থেকে ফিরছে সরকারি নিয়ন্ত্রণে

মোহাম্মদ আসিফ, চট্টগ্রাম: – এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ার টেক পরিচালিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) দায়িত্ব অবশেষে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) হাতে। আগামী ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শেষ হবে, এবং ৭ জুলাই থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ সরাসরি এনসিটির অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে বলে নিশ্চিত করেছে বন্দরের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক জানিয়েছেন, সাইফ পাওয়ার টেক-এর সঙ্গে চুক্তির আরও নবায়ন হচ্ছে না। এখন থেকে বন্দরের নিজস্ব জনবল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ পরিচালিত হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, যদিও তা এখনও চূড়ান্ত নয়।

এনসিটির গুরুত্ব ও অতীত প্রেক্ষাপট

২০০৭ সালে প্রায় ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এনসিটি বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনাল। এতে রয়েছে ৫টি জেটি এবং আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। এতদিন এ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে ছিল সাইফ পাওয়ার টেক, যাদের চুক্তি ১২ বার নবায়ন করা হয়েছিল।

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীদের একাংশ অভিযোগ করেন, সাইফ পাওয়ার টেক রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে একচেটিয়া ব্যবসা পরিচালনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার তরফদার রুহুল আমীন আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত এবং তাঁর ব্যবসা পরিচালনায় সরকারি প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করে, এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের সুবিধাভোগীদের মধ্যে ছিলেন শেখ পরিবারের সদস্যসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও এমপি, যারা নিয়মিতভাবে সুবিধা নিয়েছেন টার্মিনাল পরিচালনা থেকে। এমনকি পূর্ববর্তী সরকার এনসিটি দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

নতুন শুরুর প্রস্তুতি

বর্তমান সরকার আগামী ছয় মাসের জন্য এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব সরাসরি বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে প্রতি মাসে ৭ কোটি টাকা করে মোট ৪২ কোটি টাকার বাজেট চেয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ে

এরই মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন ট্র্যাক্টর, ট্রেইলার ও প্রাইম মুভার সংগ্রহে দরপত্র আহ্বান করেছে, যার আওতায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ড্রাইভার, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও সরবরাহ করতে হবে। আগামী ৩ জুলাই দরপত্র জমার শেষ দিন, সেদিনই তা খোলা হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) এসএম হাবিবুল্লাহ আজিম জানিয়েছেন, এটি এনসিটি পরিচালনায় প্রস্তুতির প্রাথমিক ধাপ। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর নিজস্ব সক্ষমতায় পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।

স্টেকহোল্ডারদের মতামত

বার্থ শিপ হ্যান্ডলিং ও টার্মিনাল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বন্দর কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “শুরুতে কিছুটা সমস্যা হলেও তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।”

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, “এনসিটি কে চালাচ্ছে সেটা বড় বিষয় নয়, সেবা কত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নের চাপে নয়, দেশ ও জাতির স্বার্থে পরিচালনা করা জরুরি।”

Please follow and like us:

     এই বিভাগের আরো খবর

আমাদের পেজ লাইক করুন

error: Content is protected !!